Top News

6/recent/ticker-posts

পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘শাহানশাহ’ এখন আরেক আফ্রিদি

নিউজ বিডি ডেস্কঃ

লান্ডিকোটাল এলাকাটা পাকিস্তানের বিশেষ এক জায়গা। পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। বিদেশি জিনিসের বড় একটা বাজারও সেখানে আছে। পাকিস্তান–আফগানিস্তান সীমান্তের কাছে অবস্থিত এ শহর বেশ দুর্গমও। কিন্তু ক্রিকেট এ শহরের কিশোরদের আগ্রহ আর আনন্দের বিষয়। বলে ইলেকট্রিক টেপ পেঁচিয়ে এবড়োখেবড়ো পাহাড়ি ভূমিতেই দিনভর চলে ক্রিকেট। লান্ডিকোটালের মাঠে টেপ টেনিস দিয়ে ক্রিকেট খেলা কিশোরদের মধ্যেই যে এক নতুন শাহানশাহকে পাকিস্তান পেয়ে যাবে, সেটি কে জানত!

কে এই শাহানশাহ? কেন? গতকাল দুবাইয়ে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের পর থেকে পাকিস্তান ক্রিকেটের নতুন ‘শাহানশাহ’ যে ওই শাহিন শাহ আফ্রিদিই।

ওয়ানডে বলুন আর টি-টোয়েন্টি...ক্রিকেটের বিশ্বকাপে এই প্রথম ভারতকে হারিয়েছে পাকিস্তান। দারুণ সেই জয়টি এসেছে দুই দলের ১৩তম লড়াইয়ে এসে। গতকাল থেকে পাকিস্তানিদের কাছে হয়তো ‘১৩’ সংখ্যাটি তাই আর দুর্ভাগ্যের কিছু নয়। এ সংখ্যা এখন তাদের কাছে সৌভাগ্যের। আনন্দের। গর্বেরও।

ভারতকে হারানোর মধ্যেই আরেক আনন্দ উপভোগ করছে পাকিস্তানিরা। সে আনন্দ দারুণ এক অস্ত্র নতুন করে আবিষ্কার করার। পাকিস্তান ক্রিকেটের রাজ্যপাটে নতুন এক ‘শাহানশাহ’র আবির্ভাবের। শাহিন শাহ আফ্রিদি কাল যা করেছেন, তারপর তাঁকে পাকিস্তান ক্রিকেটের নতুন ‘শাহানশাহ’ বলাটা খুব বাড়াবাড়ি কিছু নয়।

সাবেক অধিনায়ক মুশতাক মোহাম্মদকে বিশাল একটা ধন্যবাদ দিতেই পারে পাকিস্তানিরা। বছর কয়েক আগে লান্ডিকোটালের এক স্থানীয় অনূর্ধ্ব–১৬ বছর বয়সী ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় ভাগ্যিস তিনি গিয়েছিলেন। পাকা জহুরির মতোই তাঁর চোখ আটকে যায় লম্বা–লিকলিকে এক ছেলের বোলিংয়ে। বাঁ হাতে জোরে বল করে সে। চেহারা খুবই সহজ–সরল। কিন্তু বল হাতে সেই সরল ছেলেটিই হয়ে ওঠে ভয়ংকর।

খোঁজ নিয়ে মোশতাক জানতে পারেন, স্থানীয় আফ্রিদি গোত্রের এই ছেলের ধ্যানজ্ঞান টেনিস বলে টেপ পেঁচিয়ে বল করা। লান্ডিকোটালে মাঠের বড় অভাব। পাহাড়–পর্বতের ফাঁকফোকরে যে এক–দুই চিলতে জমি আছে, সেগুলোও পাথুরে। এর মধ্যেই ছেলেটি যতটা সম্ভব জোরে বল করে যায় স্থানীয় ক্রিকেট ম্যাচগুলোতে। খেলা না থাকলে দিনভর সে নিজে নিজেই বল করে। নিজের সঙ্গেই যেন তার প্রতিযোগিতা—কতটা নিখুঁত করা যায় সেই বোলিং!

মুশতাকের দারুণ পছন্দ হলো ছেলেটিকে। এর মধ্যেই আরেকটি প্রতিযোগিতায় ফাস্ট বোলিং করে সবচেয়ে বেশি উইকেট পেল সে। ব্যস, মুশতাক সিদ্ধান্ত নিলেন দুর্গম এলাকার এই ছেলেকে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে বাইরে নিয়ে আসবেন। পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্দরে পরিচয় করিয়ে দেবেন। দিলেনও। ছেলেটিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

স্থানীয় বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে একটা সময় তাঁর সুযোগ হয়ে যায় পাকিস্তানের বয়সভিত্তিক দলে। কায়েদে আজম ট্রফিতে সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচেই আট উইকেট—সেখান থেকেই ধীর ধীরে নিজেকে শাণিত করা, এরপর গতকালের দুবাই ম্যাচ। শাহিন শাহ আফ্রিদির পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘শাহানশাহ’ হয়ে ওঠার গল্পটা এমনই।

পাকিস্তান ক্রিকেটে আর যার–ই অভাব থাক, ফাস্ট বোলারের অভাব নেই। যে দেশের গলি–ঘুপচিতে ফাস্ট বোলাররা বেড়ে ওঠে, যে দেশ ইমরান খান, সরফরাজ নেওয়াজ থেকে শুরু করে ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, আকিব জাভেদ কিংবা মোহাম্মদ আসিফ, মোহাম্মদ আমির, ওয়াহাব রিয়াজদের মতো ফাস্ট বোলারদের জন্ম দেয়, সেখানে শাহিন শাহ আফ্রিদির উত্থানটা বিশেষ কিছু নয়। কিন্তু হালের ফাস্ট বোলারদের সঙ্গে শাহিন শাহ আফ্রিদির পার্থক্যটা হলো তিনি অনেকের চেয়ে আলাদা।

ভারতের বিপক্ষে রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুল, বিরাট কোহলিদের উইকেট তুলে নিয়ে তিনি নায়কের আসনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আগেও নানা কীর্তি তাঁর আছে। তবে শাহিন আফ্রিদির বিশেষত্ব হচ্ছে প্রতিনিয়ত শাণিত হয়ে উঠছেন তিনি, আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছেন।

ম্যাচের আগেই পাখির চোখ করেছিলেন ভারতের সেরা ব্যাটসম্যানদের উইকেট। সেটির বাস্তবায়ন করে দেখানোটা তো আর যা-তা বিষয় নয়। গতির আগুনে রীতিমতো পুড়িয়েছেন ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপকে। প্রথমে রোহিত শর্মা, এরপর লোকেশ রাহুল, সবশেষে অধিনায়ক বিরাট কোহলি। ভারতের তিন সেরা ব্যাটসম্যানকে ফিরিয়ে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম জয়ের রাস্তাটা প্রশস্ত করেছেন এই বাঁহাতি ফাস্ট বোলারই। তাঁর গড়ে দেওয়া ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই তো বাবর আজম আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের আত্মবিশ্বাসী লড়াই।

এমন দারুণ জয় যাঁর হাতে ধরে, তাঁকে তো ‘শাহানশাহ’ বলা যায়–ই!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ